রাজবাড়ী থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় রেললাইন স্থাপনের কাজ যৌথভাবে করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করতেই এ প্রকল্প নেওয়া হয়। কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া এ প্রকল্পটি নেওয়া হয়। ২০১০ সালে নেওয়া এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ১০১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। ওই সময়ের মধ্যে তিনবার সময় বৃদ্ধির সঙ্গে নির্মাণ ব্যয় বাড়ানো হয় ৯৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১ হাজার ১০১ কোটি টাকার প্রকল্প গিয়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৫ কোটি টাকায়। শেখ হাসিনার ঘরের প্রকল্পেও (টুঙ্গিপাড়ায় রেলপথ) লোপাট করা হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০১০ সালে পাবনার ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর পর্যন্ত রেললাইন প্রকল্প নেওয়া হয়। পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও সাড়ে তিন বছর সময় বাড়িয়ে ২০১৮ সালের শেষে বুঝিয়ে দেওয়া হয় প্রকল্পের কাজ। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮৩ কোটি টাকা। ৩ দফা প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ বাড়িয়ে করা হয় ১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। শেখ হাসিনার নির্দেশনায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন নজিরবিহীন।
গত ১৬ বছরে এ ধরনের অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই না হওয়া মানেই ইচ্ছেমতো ব্যয় ধরে প্রকল্পের প্রায় ৭৫ শতাংশ অর্থই লোপাটের আয়োজন করা হয়েছে। এ প্রকল্পটির ঠিকাদারও ছিল ম্যাক্স গ্রুপ। ২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ট্রেন চলে মাত্র একটি। কিন্তু দুটি রুটে ২০ থেকে ২৮টি ট্রেন চলার কথা ছিল।
ম্যাক্স ও তমা রেলের গডফাদার। প্রতিষ্ঠান দুটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনায় প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রী-সচিবদের দিয়ে শুধু অনুমোদন করাত। এই কাজ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে করতেন মির্জা আজম। আজমের সহযোগিতায় যে মন্ত্রী-সচিব রেলে দায়িত্ব নেন তাদের সবার ঘরের অন্দরমহলে ঢুকে যেতেন তমা ও ম্যাক্সের কর্ণধার। এরা এককভাবেই রেলে কাজ করতেন এমনটা নয়- তারা বিভিন্ন কৌশলে নিজেদের কাজ পাওয়ার যোগ্যতা বাড়াতে চীন কিংবা অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামনে রেখে ‘জয়েন্ট ভেঞ্চার’ কাজ হাতিয়ে নেয়। নামে জয়েন্ট ভেঞ্চার হলেও-মূলত প্রকল্পের নিয়ন্ত্রক ম্যাক্স-তমা গ্রুপ।
অনুসন্ধানে চট্টগ্রামের দোহাজারি থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ভয়াবহ লোপাটের চিত্র পাওয়া গেছে।
এই রুটের ১০১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ২০১৬ সালে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৮৩৪ কোটি টাকা। এ কাজও পায় ম্যাক্স ও তমা। এটা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্প। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটির কর্ণধাররা মির্জা আজমের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে নেন।
রেলে কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী ম্যাক্স-তমার হয়ে কাজ করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রকল্পের প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। তথ্য অনুযায়ী আমেরিকা, জাপান, চীনসহ উন্নত দেশেও সর্বোচ্চগতির রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারে খরচ সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৮০ কোটি টাকা। দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ প্রকল্প নির্মাণ শেষে ওই রুটে বর্তমানে ৩টি ট্রেন চলাচল করছে। অথচ প্রকল্প সুবিধায় বলা হয়েছিল, প্রতিদিন গড়ে ২৪ থেকে ২৮টি ট্রেন চলাচল করবে। তবে আখাউড়া-লাখসাম রেললাইন নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির সব রেকর্ড ভেঙেছে ম্যাক্স ও তমা। ২০১৪ সালে অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা।
পরবর্তীতে ব্যয় বেড়ে ৬ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা দাঁড়ায়। এ প্রকল্পের কাজ ২০২০ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো চলমান। এ প্রকল্পে মাটি ভরাটের কাজে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ আছে। এ নিয়ে দুদক তদন্তও করছে।
প্রকল্পটির জন্য ৫ লাখ ৮৮ হাজার ঘনমিটার মাটির জোগান দেওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে বাড়িয়ে মাটির পরিমাণ করা হয় ১১ লাখ ঘনমিটার। ২৮০ টাকা ঘনমিটারের মাটির দাম পরে নির্ধারণ করা হয় ৬৫০ টাকা। শুরুতে মাটির কাজে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
শেষ পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯০০ কোটি টাকায়। কার্যত সিন্ডিকেট করে মাটির পরিমাণ ও দাম বাড়িয়ে এ বিপুল টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়াতে না চাইলে অনেক প্রকৌশলীকে লাঞ্ছিতও করেছে তমা-ম্যাক্সের ক্যাডার বাহিনী। কথামতো কাজ না করায় অনেক প্রকৌশলীকে বদলি এবং ওএসডি করা হয়েছে হরহামেশাই।
এভাবেই ত্রি রত্নের হাতে লুট হয়েছে রেল। গত সাড়ে ১৫ বছর তারা রেলে দুর্নীতি ও মাফিয়াতন্ত্র রাজত্ব করেছিলেন।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।
সম্পাদক: ডাঃ মির্জা মহিবুল হাছান, নির্বাহী সম্পাদক: মির্জা রকিবুল হাসান, সহকারী ব্যবস্থাপক: ফরিদুল আলম.
কার্যালয়: 70/E, Purana Paltan Line, 5th Floor, Dhaka-1000. নিউজ ও বিজ্ঞাপন : 01611507422 ইমেইল: bongosangbad.news@gmail.com, dailybongoshanbad@gmail.com
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বঙ্গ সংবাদ