অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাপক উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও এ নির্বাচনে সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (অর্থাৎ ৩০০টির মধ্যে ১৫১ আসন) অর্জন করতে পারেনি। তাই জামায়াতের সমর্থন নিয়ে দলটিকে সরকার গঠন করতে হয়।
এ নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিম্নে বর্ণিত সংখ্যার আসন পায় : ১. বিএনপি ১৪০টি, ২. জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, ৩. আওয়ামী লীগ ৮৮টি, ৪. জাতীয় পার্টি ৩৫টি, ৫. ইসলামী ঐক্য জোট একটি। মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৩০টি আসনের মধ্যে জামায়াত দুটি আসন লাভ করে। মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন নিয়ে বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে সরকার পরিচালনা করে। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৫.৪৫ শতাংশ। বিএনপি ভোট পায় ৩০.৮ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ পায় ৩০.১ শতাংশ। দুটি দলের মধ্যে ভোটের হারের ব্যবধান ছিল মাত্র ০.৭ শতাংশ।
মাগুরা উপনির্বাচন : এক বছরে দুটি সংসদ নির্বাচন
বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকাকালীন মাগুরা উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টির সংসদ-সদস্যরা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করে তীব্র আন্দোলন শুরু করে।
HEED THE SIGNAL: Unity of nationalist forces can save BNP in next polls’ (সংকেতটিতে গুরুত্ব দিন : জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যই পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপিকে বাঁচাতে পারে) শিরোনামে আমার সম্পাদিত ‘এভিডেন্স’ পত্রিকায় ৭-১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪ সংখ্যায় প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কিন্তু সংকেত দেওয়া সত্ত্বেও কোনো কাজ হয়নি, কারণ ক্ষমতায় থাকাকালীন কারও মাথা সঠিকভাবে কাজ করে না।
শেষ পর্যন্ত আন্দোলন, সংঘাত এবং সহিংসতার ভেতর দিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছিল ১৯ মার্চ ১৯৯৬ সালে এবং অধিবেশন স্থায়ী ছিল চার কার্যদিবস, ২৫ মার্চ ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। ৩০ মার্চ ১৯৯৬ সালে সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। সংসদ স্থায়ী ছিল মাত্র ১২ দিন। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করতে হয় বিএনপিকে এবং এর চার মাস পর জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি জোটের কাছে পরাজিত হতে হয় দলটিকে।
১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের ফলাফল
১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল : ৩৭.৪৪ শতাংশ, আসন পায় ১৪৬টি। বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের হার ৩৩.৬১ শতাংশ, আসন পায় ১১৬টি। জাতীয় পার্টির প্রাপ্ত ভোটের হার ১৬.৪ শতাংশ, আসন পায় ৩২টি; বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভোটের হার ৮.৬১ শতাংশ, আসন পায় তিনটি। ইসলামী ঐক্যজোট প্রাপ্ত ভোটের হার ১.০৯ শতাংশ। আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ভোটের ব্যবধান ছিল ৪ শতাংশ এবং জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভোট যোগ করলে ব্যবধান হয় ২০ শতাংশ। জোটবিহীন বিএনপির নির্বাচনি ফলাফল হতাশাজনক ছিল।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ‘এভিডেন্স’ পত্রিকায় ৭-১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের গুরুত্ব বেড়ে যায়। রিপোর্টের আলোকে চারদলীয় জোট গঠন করা হয়। ১৯৯৬-২০০১-এ জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামি শক্তির ঐক্যের (চারদলীয় জোট) কারণে আওয়ামী লীগের বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন [জাতীয় পার্টি (এরশাদ)+আওয়ামী জোট] চুরমার করে দেয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচন।
২০০১-এর নির্বাচনের দলভিত্তিক ভোটের তালিকা
১. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ১৯৩, ভোটের আনুপাতিক হার ৪০.৯৭ শতাংশ; ২. জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আসন সংখ্যা ১৭, ভোটের হার ৪.০৬ শতাংশ; ৩. বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (নাফি) প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ৪, ভোটের আনুপাতিক হার ১.১২ শতাংশ; ৪. ইসলামী ঐক্যজোটের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা ২, ভোটের আনুপাতিক হার ০.৬৮ শতাংশ।
চারদলীয় জোটের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ দলগুলোর ভোটের ব্যবধান
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ২০০১-এর নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ভোটের ব্যবধান ছিল ১ শতাংশের কম অর্থাৎ ০.৮৪ শতাংশ। চারদলীয় জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগ জোটের ভোটের ব্যবধান ছিল ১.৪ শতাংশ। সার্বিক ভোটের ব্যবধান যা ছিল তাতে আশ্চর্য হতে হয়। ৭৫ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি ছিল এ নির্বাচনে।
গণতন্ত্রের বাধা হলো ভারত
১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যখন গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছিল, তখন ভারত ন্যক্কারজনকভাবে প্রকাশ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে ১/১১-এর সরকার গঠনে মদদ দিয়ে গণতন্ত্র ধ্বংস করে দেয়। ভারত সবসময়ই মনে করেছে, বাংলাদেশকে পদানত করে রাখতে না পারলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য হাতছাড়া হয়ে যাবে। রাজ্য হারানোর ভয়ে দেশটি সবসময়ই আচ্ছন্ন (অবসেসড) হয়ে থাকে। আধিপত্যবাদী এ শক্তির নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে বারবার। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এবং গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিলে জনগণ যে ভারতের মদদপুষ্ট দলগুলোকে পরাজিত করবে তা সহজেই বোঝা যায়।
অতীত অভিজ্ঞতা
১৯৯১-৯৬ সময়কালে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল আর বিরোধীদলীয় অবস্থানে থেকে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি একত্রে ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ফলাফল দেখলে বোঝা যায়, দল দুটি একত্রে নির্বাচন করলে ফলাফল কী দাঁড়ায়। ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপি+জামায়াত+এনসিপি কার্যত (de facto) ক্ষমতায় আছে আর আইনগতভাবে (de jure) ক্ষমতায় আছেন ড. ইউনূস। ক্ষমতায় থেকে বা ক্ষমতার সুবাস নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে জনগণ সেটাকে কীভাবে গ্রহণ করবেন তা দেখার বিষয়।
আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় আসন্ন নির্বাচনে
অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ভারতের মাধ্যমে দলটি চেষ্টা করছে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার জন্য। যতক্ষণ তা তারা করতে পারছে না, ততক্ষণ প্রক্সি হিসাবে জাতীয় পার্টি এবং তার মিত্রদের রাজনৈতিক মঞ্চে জেঁকে বসাতে সাহায্য-সহযোগিতা করছে। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও তার দোসর জাতীয় পার্টি বিরোধীদের ঐক্য আবারও গড়ে উঠতে পারে।
ঐক্যের প্রয়োজন
১৯৭৯, ১৯৯১, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি শক্তি যেভাবে ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির মদদপুষ্টদের মোকাবিলা করেছে, ঠিক তেমনিভাবে এ অপশক্তিকে ভবিষ্যতে আন্দোলনে ও নির্বাচনে মোকাবিলা করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আন্দোলনরত, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সৈনিকরা কি এতই দুর্বল হয়ে গেছে, যারা ২০০৮ সালের বিতর্কিত সংসদ নির্বাচন, ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জনকে বিজয়ী ঘোষণা, ২০১৮ সালে দিনের ভোট আগের রাতে দেওয়া এবং ২০২৪ সালে ‘আমি তুমি ও ডামি’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ কায়েম করে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, তাদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা প্রতিহত করতে পারবেন না। বিশ্বের কোথাও ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসিত হওয়ার নজির নেই, বাংলাদেশেও এ নজির স্থাপন করতে দেওয়া হবে না।
দ্বৈত শাসন
বাংলাদেশে এখন চলছে দ্বৈত শাসন। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করে লাভ নেই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দ্বৈত শাসনের অবসান না ঘটালে, দুই শিবিরের টানাপোড়েনে নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ‘ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানই এখন চ্যালেঞ্জ’ বলে রাজনৈতিক নেতারা ইতোমধ্যেই বক্তব্য দেওয়া শুরু করেছেন।
প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ : ভারতীয় আধিপত্যবাদ রুখতে হবে
সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করতে হলে জনগণকেই মাঠে নামতে হবে, যেমনভাবে তারা নেমেছিলেন ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪-এ। ভোটের অধিকারের জন্য জনগণকে লড়াই করতে হয়েছে এবং সে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে রাষ্ট্রের মালিকানা নিশ্চিত করতে জনগণকে আবার মাঠে নামতে হবে, নইলে যেনতেন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দুর্বল সরকারকে অতীতের মতো ক্ষমতাচ্যুত করে দেবে ফলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য হয়তো আরও দু’দশক অপেক্ষা করতে হতে পারে। ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠনের যে সুযোগ এসেছে, তা হাতছাড়া করতে চায় না সাধারণ মানুষ।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ৩১ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনাসভা শেষে গণমাধ্যমে বলেন, ‘গণতন্ত্রকামী দেশপ্রেমিক ভারতবিরোধী শক্তির পক্ষে এরকম পরিকল্পিত নীলনকশার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবে, যা দেশের জন্য কোনোভাবে কল্যাণ হবে বলে আমরা মনে করি না।’
জাতির এ ক্রান্তিকালে তাই সব জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামি শক্তির ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এভিডেন্স পত্রিকা আজ থেকে ৩১ বছর আগে এ সত্যটি উপলব্ধি করেছিলে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য নতুন করে প্রসঙ্গটি আবার সামনে আনা হলো।
মেজর (অব.) মনজুর কাদের : সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ-সদস্য
সম্পাদক: ডাঃ মির্জা মহিবুল হাছান, নির্বাহী সম্পাদক: মির্জা রকিবুল হাসান, সহকারী ব্যবস্থাপক: ফরিদুল আলম.
কার্যালয়: 70/E, Purana Paltan Line, 5th Floor, Dhaka-1000. নিউজ ও বিজ্ঞাপন : 01611507422 ইমেইল: bongosangbad.news@gmail.com, dailybongoshanbad@gmail.com
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বঙ্গ সংবাদ