মিয়ানমারের অভ্যন্তরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তোতার দ্বীয়া দ্বীপের দখলকে কেন্দ্র করে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছেন সীমান্তবর্তী হাজারো বাংলাদেশি নাগরিক। বিশেষ করে ইয়াবা পাচার ও চোরাচালান নির্বিঘ্ন রাখতে এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী দ্বীপ দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কথিত রোহিঙ্গা নেতা নবী হোসেন ও তার অনুসারীরা দ্বীপ দখলের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে পড়ার ঘটনা বেড়েছে।
টেকনাফের লম্বাবিল সীমান্ত এলাকায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন বহু মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন নাফ নদী ও সীমান্তবর্তী এলাকায় যেতে হচ্ছে তাদের। মাছ শিকারে গিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র প্রত্যক্ষ করছেন স্থানীয় জেলেরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে জানান, সীমান্ত এলাকায় নবী হোসেন গ্রুপের সদস্য সংখ্যা আনুমানিক ৩৫০ জনের বেশি ছিল। এর মধ্যে ৫৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এখনও প্রায় ২৫০ জন সেখানে অবস্থান করছে। তাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে, যা তারা আশপাশের জঙ্গলে লুকিয়ে রেখেছে। মূলত তোতার দ্বীয়া দ্বীপ দখলের লক্ষ্যেই তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তোতার দ্বীয়া দ্বীপকে কেন্দ্র করে বর্তমানে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। কৌশলগত গুরুত্বের কারণে দ্বীপটি এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, তোতার দ্বীয়া দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ থাকলে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার ও চোরাচালান কার্যক্রম সহজে পরিচালনা করা যায়। এ কারণেই দ্বীপটি দখলে নিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।
লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মো. ফোরকান অভিযোগ করে বলেন, ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ী মালামাল ও খাদ্যসামগ্রী মগ বাহিনীর কাছে সরবরাহ করছে। ব্যবসায়িক স্বার্থে তারা এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহযোগিতা করছে।
তেচ্ছিব্রিজ এলাকার জেলে আব্দু শুক্কুর (৬০) বলেন, শুরু থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য তোতার দ্বীয়া দ্বীপ দখল করা। দ্বীপটি দখলে রাখতে পারলে এটিকে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। সংঘর্ষ বা বিস্ফোরণের শব্দে সাধারণ মানুষের পক্ষে পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হবে, যা তাদের গোপন তৎপরতা সহজ করবে।
একই এলাকার বাসিন্দা সাব্বির আহমদ (২৮) বলেন, নবী হোসেন গ্রুপটি সন্ত্রাস, ডাকাতি ও অপহরণের সঙ্গে জড়িত। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় এবং হত্যার ঘটনাও রয়েছে। তাদের গোলাগুলির প্রভাব আশপাশের এলাকায় পড়ছে, এতে নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মিয়ানমারের দিক থেকে ছোড়া গুলি সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে এসে পড়ায় এলাকাবাসী চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। যেকোনো সময় প্রাণহানির আশঙ্কায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
লম্বাবিল এলাকার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, ২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গা আগমনের ফলে সীমান্ত এলাকায় অবাধ যাতায়াত বেড়েছে। এর সুযোগে অপরাধ ও সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সরকারি বাহিনীর গৃহযুদ্ধের প্রভাব সরাসরি সীমান্তে পড়ছে।
তিনি মনে করেন, বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করে সীমান্তে কঠোর আইনশৃঙ্খলা বলয় গড়ে তুললে সন্ত্রাস, অপহরণ ও অস্ত্র প্রবেশ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এদিকে রাখাইন রাজ্যে ত্রিমুখী সংঘাতের জেরে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে আসা ৫৭ জনের মধ্যে ৫৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিজিবি। অপর চারজন বাংলাদেশি জেলে বলে শনাক্ত হওয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়নি। তারা নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে গোলাগুলির মুখে পড়ে অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে ফিরে আসেন বলে জানিয়েছে পুলিশ ও বিজিবি।
মামলার অভিযুক্ত ৫৩ জনের মধ্যে একজন আহত অবস্থায় পুলিশ হেফাজতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অপর ৫২ জনকে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে কক্সবাজার আদালতে হাজির করা হলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সম্পাদক: ডাঃ মির্জা মহিবুল হাছান, নির্বাহী সম্পাদক: মির্জা রকিবুল হাসান, সহকারী ব্যবস্থাপক: ফরিদুল আলম.
কার্যালয়: 70/E, Purana Paltan Line, 5th Floor, Dhaka-1000. নিউজ ও বিজ্ঞাপন : 01611507422 ইমেইল: bongosangbad.news@gmail.com, dailybongoshanbad@gmail.com
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বঙ্গ সংবাদ