রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ ও স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এ প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, আর্থিক অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩৬ হাজার শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ এখন সীমিত কয়েকজনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ড পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি ছয় মাসের জন্য অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান এস এম জহরুল ইসলাম। নিয়ম অনুযায়ী তার মেয়াদ ২৯ জুলাই শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, তিনি পরবর্তী কয়েক মাসও ওই পদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সভা পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ ফাইল অনুমোদনের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড শিক্ষা প্রশাসনের প্রচলিত বিধিমালার পরিপন্থী বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, সভাপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ৩ আগস্ট একটি রেজুলেশনের মাধ্যমে লায়লা আক্তারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অথচ শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, অ্যাডহক কমিটির এমন নিয়োগ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই।
এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড-এর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কাউকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিলেও তা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর-কে অবহিত করতে হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তা করা হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে।
লায়লা আক্তার দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের ৯ মার্চ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি অবসরে যান। যদিও তার দাবি, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগ ছিল না, বরং তাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটিতে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম ঘিরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিভাবকদের দাবি, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে। সেশন ফি বৃদ্ধি, বিভিন্ন খাতে অযৌক্তিক চার্জ আরোপ এবং নানা অপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহনসহ অন্যান্য সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি অভিভাবকদের।

আরেকটি আলোচিত অভিযোগ হলো দোহারে একটি আবাসন প্রকল্পে স্কুলের শাখা খোলার উদ্যোগ। অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রকল্পে জমি কেনার জন্য শিক্ষকদের ওপর মানসিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। যারা এতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন, তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশন জাহান জানিয়েছেন, দোহারে শাখা খোলার একটি প্রস্তাব ছিল এবং শিক্ষকরা স্থানটি পরিদর্শনও করেছেন। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষককে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বরখাস্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে সভাপতি এস এম জহরুল ইসলাম বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’। তিনি দাবি করেন, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং অতীতের অনিয়ম বন্ধে তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন।
অন্যদিকে লায়লা আক্তারও নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন বলে দাবি করেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে এবং প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এখন সবার দৃষ্টি তদন্তের ফলাফলের দিকেই।
সম্পাদক: ডাঃ মির্জা মহিবুল হাছান, নির্বাহী সম্পাদক: মির্জা রকিবুল হাসান, সহকারী ব্যবস্থাপক: ফরিদুল আলম.
কার্যালয়: 70/E, Purana Paltan Line, 5th Floor, Dhaka-1000. নিউজ ও বিজ্ঞাপন : 01611507422 ইমেইল: bongosangbad.news@gmail.com, dailybongoshanbad@gmail.com
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বঙ্গ সংবাদ