চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এঁটেল মাটির তীব্র অভাব এবং জ্বালানি কাঠের আকাশ ছোঁয়া দামের কারণে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও মেলামাইনের মেকি পণ্যের ভিড়ে মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা এমনিতেই কমেছে; তার ওপর উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় শত শত কুমার পরিবার এখন এই আদি পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংকটের মূল কারণ ও পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত স্থানীয় কারিগরদের সাথে কথা বলে এই শিল্পের সংকটের পেছনে প্রধান দুটি কারণ উঠে এসেছে। এঁটেল মাটির দুষ্প্রাপ্যতা, মাটির হাঁড়ি-পাতিল বা সানকি তৈরির প্রধান উপাদান বিশেষ ধরনের এই এঁটেল মাটি। বর্তমানে ফসলি জমি হ্রাস পাওয়া এবং বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের কারণে এই মাটি মেলা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে মাটি সংগ্রহ করা যেত, এখন এক ট্রলি এঁটেল মাটি কিনতে গুনতে হচ্ছে ২০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা।
অন্য দিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে মাটির তৈরি জিনিসপত্র পোড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে কাঠ বা লাকড়ির প্রয়োজন হয়। বর্তমানে প্রতি মণ জ্বালানি কাঠের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। একটি 'পন' (মাটি পোড়ানোর বিশেষ চুলা) সম্পূর্ণভাবে পোড়াতে কয়েক হাজার টাকার জ্বালানি প্রয়োজন হয়, যা সাধারণ কুমারদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
গতকাল ২৭ সেপ্টেম্বর ( রবিবার)সকালে কুমার পাড়ার বর্তমান চিত্র সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়,বাঁশখালীর বাণীগ্রাম, কালিপুর রুদ্রপাড়া, সাধনপুর, পুকুরিয়া ও শীলকূপ, চাম্বল এলাকার কুমার পাড়া গুলোতে একসময় দিনরাত মাটির চাকা ঘোরার শব্দ শোনা যেত। এখন তা নাই। তবে বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সাধনপুর ও পূর্ব কালীপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী রুদ্র পাড়ায় বেশ কয়েকজন মৃৎশিল্পী বংশপরম্পরায় এই মৃৎশিল্প বা কুমার পেশা টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের মধ্য দিলীপ রুদ্র, উষা রুদ্র,অচিন্ত্য রুদ্র ও কণিকা রুদ্র, বিশ্বনাথ রুদ্র, চুকমী রুদ্র, গোবিন্দ রুদ্র,ছবি রুদ্র অন্যতম সক্রিয় মৃৎশিল্পী তারা দীর্ঘকাল ধরে মাটির হাড়ি-পাতিল, চাউল রাখার মটকা, বাটি কলসি,ধূপধানি, প্রদীপ, সরা, ভাপা পিঠার ছাঁচ এবং পূজার ঘট, ও তৈজসপত্র তৈরি করে আসছেন।
উষা রুদ্র,অচিন্ত্য রুদ্র ও কণিকা রুদ্রদের কাছে জানতে চাইলে তারা বললেন, আমাদের এই কুটিরশিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে এখনো বিরাট অবদান রেখে চলছে। মৃৎশিল্পীরা এর ব্যতিক্রম নন। গ্রামীণ মেলা, বৈশাখীমেলা, কুম্ভমেলার অন্যতম আকর্ষণ মৃৎশিল্প। আমাদের কুমারদের মাটির হাঁড়ির খ্যাতি রয়েছে। এ ছাড়া মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল আসবাবপত্র স্বাস্থ্যসম্মত। মাটির হাঁড়িতে শীতকালে গরম ও গরমকালে জিনিস ঠাণ্ডা থাকে। সঙ্গত কারণে এ শিল্প যাতে হারিয়ে না যায়, এ জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের মৃৎশিল্পীকে সময়োপযোগী সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রয়োজন মনে করি।
কালীপুর, চাম্বলের বিশ্বনাথ রুদ্র, চুকমী রুদ্র বললেন, গত ৫ বছরে প্রায় ৬০% কারিগর আমাদের বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অনেকে দিনমজুর, সিএনজি, টমটমচালক বা কোননা কোন পেশায় যুক্ত হয়ে পড়েছে। আর যারা এই পেশায় জড়িয়ে রয়েছে, তারা কেবল ঋণের বোঝা নিয়ে। তারা চড়া সুদে দাদন বা ঋণ নিয়ে কোনোমতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখলেও লাভের মুখ দেখছেন না।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, বাঁশখালীর এই অঞ্চলের মৃৎশিল্পীদের (কুমার সম্প্রদায়)। মৃৎশিল্প মূলত স্থানীয় রুদ্র এবং পাল বংশীয় পরিবারগুলোর মাধ্যমে বংশানুক্রমিকভাবে শত শত বছর ধরে টিকে রয়েছে। তাদের এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প ও বংশধারা টিকিয়ে রেখেছেন। এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারি উদ্যোগ জরুরি। মৃৎশিল্পীদের জন্য স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় স্থায়ীভাবে মাটি ও জ্বালানি প্রাপ্তির সুবিধা নিশ্চিত করা। আধুনিক মৃৎশিল্পের প্রশিক্ষণ ও প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে মাটির পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিতে সচেতনতা তৈরি।
সম্পাদক: ডাঃ মির্জা মহিবুল হাছান, নির্বাহী সম্পাদক: মির্জা রকিবুল হাসান, সহকারী ব্যবস্থাপক: ফরিদুল আলম.
কার্যালয়: 70/E, Purana Paltan Line, 5th Floor, Dhaka-1000. নিউজ ও বিজ্ঞাপন : 01611507422 ইমেইল: bongosangbad.news@gmail.com, dailybongoshanbad@gmail.com
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বঙ্গ সংবাদ