চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার একটি সীমান্তবর্তী বজরাটেক এলাকায় তিন বন্ধুর তাক লাগানো উদ্ভাবন
আমরা সাধারণত পাকা আম খাওয়ার পর এর খোসা বা চোকা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দিই। যে ফেলে দেওয়া অংশকে এতদিন পর্যন্ত একেবারে অর্থহীন মনে করা হতো, এবার সেই আমের খোসা থেকেই তৈরি হচ্ছে উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন ব্যতিক্রমী ও সুস্বাদু ‘ম্যাংগো পিল টি’ বা আমের খোসার চা! চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার বজরাটেক এলাকায় তিন তরুণের এমন উদ্ভাবন পুরো এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন তিন বন্ধু মোঃ মাইনুল ইসলাম (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী), মোঃ মিঠু (সরকারি চাকরিজীবী) এবং এ. বান্না মাসুম (আইটি ব্যবসায়ী)। তারা তিনজনে মিলে গড়ে তুলেছেন ‘সবুজ খাবার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
উদ্যোক্তারা জানান, এই পথচলার মূল প্রেরণা ছিল ২০২২ সালের একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি। সে বছর আম মৌসুমে হঠাৎ আমের দাম এতটাই কমে যায় যে, কৃষকরা আম বিক্রি করতে না পেরে তা গরুকে খাওয়াতে বাধ্য হন। লোকসান থেকে বাঁচতে অনেকে আম গাছ কেটে ফেলার মতো চরম সিদ্ধান্তও নিতে শুরু করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ঐতিহ্য ও আমচাষীদের এই সংকটময় মুহূর্তে আমকে রক্ষা করার তীব্র তাগিদ থেকে এই তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত নেন প্রক্রিয়াজাত আম নিয়ে কাজ করার। প্রথমদিকে ২০২২ সাল থেকে তারা শুকনো আম (ড্রাই ম্যাংগো) ও আমের পাউডার তৈরি করা শুরু করেন। কিন্তু ড্রাই ম্যাংগো বানানোর সময় দেখা যেতো বিপুল পরিমাণ আমের খোসা ফেলে দিতে হচ্ছে। বর্জ্য হিসেবে পড়ে থাকা এই খোসাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় এই ভাবনা থেকেই ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি শুরু করেন তারা। একপর্যায়ে জানতে পারেন, আমের খোসা দিয়েও অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন চা তৈরি সম্ভব। এরপরই পরীক্ষামূলক তৈরী করেন পরবর্তীতে রূপ নেয় এক অনন্য সফলতায়। প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে কেবল উদ্ভাবনী চিন্তাই নয়, দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছেন তারা। আম শুকাতে (ড্রাই করতে) প্রয়োজনীয় উন্নতমানের মেশিন চায়না থেকে আমদানি করতে খরচ হতো প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু তিন বন্ধু তাদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে মাত্র ৫ লাখ টাকায় দেশীয় প্রযুক্তিতে সেই একই মানের মেশিন তৈরি করে ফেলেন, যা তাদের খরচ অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে দেয়। ১ কেজি আমের চা প্রস্তুত করতে প্রায় ১৪ কেজি আমের খোসার প্রয়োজন হয়। এই ম্যাংগো পিল টি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ হতেও কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপ অতিক্রম করতে হয়, বাজার থেকে সেরা মানের আম সংগ্রহ করা হয়,আমগুলো ভালোভাবে ধুয়ে এর খোসা বা চোকা ছাড়ানো হয় এরপর ছাড়ানো খোসাগুলো তাদের নিজস্ব তৈরি মেশিনে প্রায় ৪ থেকে ৫ দিন রেখে সম্পূর্ণ শুষ্ক (ড্রাই) করা হয় তারপর শুকনো খোসাগুলো ব্লেন্ডার মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করে চায়ের প্রমিত আকৃতি ও দানায় রূপান্তর করা হয়। এরপর ফুটন্ত গরম পানিতে সামান্য প্রমিত আকৃতি দানা মিশিয়ে নিলেই মুহূর্তেই তৈরি হয়ে যায় সুস্বাদু ও সুবাসিত ‘ম্যাংগো পিল টি’। উদ্যোক্তারা আরো জানান, বর্তমানে তারা দুই ক্যাটাগরিতে এই চা বাজারজাত করছেন, ম্যাংগো পিল গোল্ড টি ৪,০০০ টাকা কেজি (এটি গ্রাহকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়)।
ম্যাংগো পিল ডার্ক টি ২,০০০ টাকা কেজি। স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনে তাদের ফেসবুক পেজ ‘সবুজ খাবার’-এর মাধ্যমে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই চা বিক্রি করছেন এবং প্রতিনিয়ত অর্ডারও পাচ্ছেন ব্যাপক। শুধুমাত্র আমের খোসার এই চা বিক্রি করেই বর্তমানে তারা মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন। পুরো আমটার একটি অংশও এখন আর ফেলনা যাচ্ছে না, আম থেকে ড্রাই ম্যাংগো, পাউডার এবং অবশিষ্টাংশ থেকে চা সবটাই তারা বাণিজ্যিক রূপ দিয়েছেন। আমের ফেলে দেওয়া উপাদান থেকে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর চা তৈরির এই উদ্ভাবন দেখে তাজ্জব বনে গেছেন বজরাটেক গ্রামের বাসিন্দারা। স্থানীয়রা এই চা পান করে এর স্বাদ ও সুবাসের ভূয়সী প্রশংসা করছেন।
এই বিষয়ে ভোলাহাট উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ সুলতান আলী বলেন,"আমের ফেলে দেওয়া অংশ থেকে তারা যে ম্যাংগো চা বানাচ্ছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়। আমরা এই ধরনের উদোক্তাদের পাশে সবসময় আছি, তাদের সবরকম সহযোগিতা করে আসছি এবং যা সাপোর্ট লাগে আমরা তাদের দিবো। আমরা চাই এই ধরনের উদোক্তা আরো তৈরী হোক"।
তিন বন্ধুর এই মেধা, শ্রম ও ইচ্ছাশক্তি প্রমাণ করে দিয়েছে সঠিক ভাবনা আর সদিচ্ছা থাকলে ফেলে দেওয়া আমের চোকা থেকেও বিশ্বমানের সম্ভাবনা উন্মোচন করা সম্ভব।
সম্পাদক: ডাঃ মির্জা মহিবুল হাছান, নির্বাহী সম্পাদক: মির্জা রকিবুল হাসান, সহকারী ব্যবস্থাপক: ফরিদুল আলম.
কার্যালয়: 70/E, Purana Paltan Line, 5th Floor, Dhaka-1000. নিউজ ও বিজ্ঞাপন : 01611507422 ইমেইল: bongosangbad.news@gmail.com, dailybongoshanbad@gmail.com
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বঙ্গ সংবাদ