তাদের দাবি, মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে কয়েকগুণ বেশি দরদাতা দুটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত করেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেলিম মিঞা। শেরপুর জেলা হাসপাতালের ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য চলমান দরপত্র বাতিল করে পুনরায় দরপত্র দেয়ার দাবি ঠিকাদারদের।
হাসপাতালের ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের দরপত্রে অংশ নেয়া প্রান্ত ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি মীর কাশেম সময় সংবাদকে বলেন, ‘আমি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আহ্বান করা দরপত্রের সব নিয়ম পালন করে প্রান্ত ইন্টারন্যাশনাল নামে দরপত্রে অংশগ্রহণ করি। আমার প্রতিষ্ঠান তিনটি গ্রুপে সর্বনিম্ন এবং দুটি গ্রুপে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু আমাকে নির্বাচিত না করে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার নির্বাচিত করেন। আমি এই ঘুষখোরের অপসারণ চাই এবং নতুন করে দরপত্র আহ্বানের দাবি জানাই।
মীর কাশেমের দাবি, ওষুধ ও সরঞ্জাম ক্রয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে নির্বাচন করায় সরকারের প্রায় ৪৫ লাখ ৩ হাজার ৭৭৫ টাকা লোকসানের হবে।
জুয়াইরা ইন্টারন্যাশনালের শেরপুর প্রতিনিধি বলেন, ‘গত অর্থবছরে আমি হাসপাতালের দরপত্রে অংশগ্রহণ করে কাজ পাই। সেই ওষুধ আমি সরবরাহ করি। এবারের দরপত্রেও কর্তৃপক্ষের সব নিয়ম মেনে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু এ বছর আমার প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রের স্বল্পতা দেখিয়ে ভুয়া এবং একটি খোঁড়া অজুহাতে আমার প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত করা হয়েছে। চলতি বছর হাসপাতালের ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এই দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান জানাচ্ছি।’
স্বাধীন বাংলা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সুমন বলেন, ‘শেরপুর সদর হাসপাতালের দরপত্রে আমি সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পাইনি। একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র অংশগ্রহণ করার জন্য রি-টেন্ডার করা জরুরি।’
অপরদিকে, আউট সোর্সিংয়ে চাকরিরত হরিজন সম্প্রদায়ের ১৪ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ বিভিন্ন বিভাগের ৬৩ জন কর্মচারীকে দেড় বছরের বেতন-ভাতা বকেয়া রেখে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও রয়েছে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে।
চাকরি বঞ্চিতদের অভিযোগ, পূর্ব নোটিশ ছাড়াই তাদের চাকরি থেকে বের করে দিয়েছেন হাসপাতালের ডা. সেলিম মিঞা। শুধু তাই নয়, নিজের আত্মীয়-স্বজনসহ বেশ কয়েকজনকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক। বিষয়টি নিয়ে চাকরি বঞ্চিতরা কয়েকদফায় বিক্ষোভ ও মানববন্ধনও করেছে নিজেরে প্রাপ্য বেতন-ভাতা ফেরত পেতে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টো যারা বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের হাসপাতাল ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন সেলিম মিঞা।
চাকরিচ্যুত কর্মচারী মাহবুবুল আলম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘নতুন তত্ত্বাবধায়ক এসে আমাদের চাকরি থেকে বের করে দেন। কোনো অর্ডার ছাড়াই আমাদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করেছেন। শুধু তাই নয়, তার আত্মীর-স্বজনকে নতুন করে চাকরিতে নিয়োগ দিয়েছেন। আমরা ৬৩টি পরিবারের প্রায় ৩০০ লোক একবেলা, আধাবেলা খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি।’
জাহাঙ্গীর আলম নামে অপর এক চাকরিচ্যুত আউটসোর্সিং কর্মচারী বলেন, ‘এক বছরের বেতন-ভাতা বকেয়া রেখে আমাকে গায়ের জোরে হাসপাতাল থেকে বের করে দেন নতুন তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেলিম মিঞা। আমাদের চাকরিচ্যুত করে তার কয়েক জনকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি দেন। ডা. সেলিম মিঞা জিহাদ নামে তার এক ভাতিজাকেও চাকরি দিয়েছেন।’
এদিকে, তত্ত্বাবধায়ক পদে যোগদানের পর থেকে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি ইচ্ছাকৃত বন্ধ রাখার অভিযোগও রয়েছে ডা. সেলিম মিঞার বিরুদ্ধে।
হাফিজুর রহমান নামে হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান বলেন, ‘এই তত্ত্বাবধায়ক জুলাই মাসে যোগদান করার পর থেকে হাসপাতালের বৈকালিক সেবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করে দেন। জুলাই মাস থেকে এই যন্ত্রপাতিগুলো অকেজো পড়ে রয়েছে।’
অচিরেই বৈকালিক সেবা চালুর দাবি জানান হাফিজুর। এতে সরকারের কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি নষ্টের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি রোগীরাও সঠিক সেবা পাবেন বলে মনে করেন তিনি।
এসব অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সময় সংবাদের প্রতিবেদককে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য নানা ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করেন তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেলিম মিঞা। এমনকি হেনস্তা ও লাঞ্ছিত করে তার কক্ষে একঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন প্রতিবেদক ও সময় সংবাদের চিত্র সাংবাদিককে। পরে অন্য সহকর্মীরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি বিষটি শুনেছি। এখন পর্যন্ত আমাকে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সুপারিশসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিব।’