ত্রিপুরার আগরতলায় সহকারী হাইকমিশনে হামলা এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি মনে করছে রাজনৈতিক দলগুলো। এর প্রতিবাদে গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। মশাল মিছিল করেছে ছাত্র অধিকার পরিষদ। এ ছাড়া নিন্দা জানিয়েছে বিএনপি, হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিস ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। ভারতীয় গণমাধ্যমে অপপ্রচার বন্ধ এবং ওই দেশের নেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করছেন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতারা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মানববন্ধন
বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার প্রতিবাদে রাজধানীতে একাধিক বিক্ষোভ মিছিল করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ ছাড়া সংবাদ সম্মেলন করে ছয় দফা দাবি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। গতকাল সোমবার রাত ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীবৃন্দ ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়। এতে ‘হাইকমিশনে হামলা কেন– দিল্লি তুই জবাব দে’, ‘গোলামি, না আজাদি– আজাদি আজাদি’, ‘দিল্লি, না ঢাকা– ঢাকা ঢাকা’ স্লোগান শোনা যায়। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার, তরিকুল ইসলাম ও নির্বাহী কমিটির সদস্য সিনথিয়া জাহিন আয়েশা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও অ্যাক্টিভিস্ট জাহিদ আহসান বলেন, আগরতলায় হাইকমিশনে হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিতে চাই, ভারতের সঙ্গে খেলা হবে সমানে সমান। কোনো রাজা-প্রজার সম্পর্ক থাকবে না। শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে আমরা ভারতের আধিপত্য মেনে নেব না।
জাতীয় নাগরিক কমিটির ছয় দফা
ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের ওপর হামলা দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। এ সময় তারা ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। গতকাল সন্ধ্যায় সংগঠনটির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এই কথা বলেন।
নাসীরুদ্দীন বলেন, আমাদের আগরতলার যে হাইকমিশন রয়েছে, সেটি আমাদের অংশ। সেখানে হামলা করা এবং কর্মকর্তাদের ওপর নিপীড়ন করা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।
তিনি বলেন, এ জন্য আমরা প্রতিবেশী দেশ, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও রাজনীতিবিদদের আহ্বান জানাব, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার চর্চা করবেন না। যদি চর্চা করেন, হয়তো বা দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ একটি বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। সে রকম একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। আমরা তাদের শান্তি বজায় রাখার আহ্বান করব। যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর হুমকি দিচ্ছে, আমরা তাদের নিবৃত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
এ সময় জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে মাসব্যাপী ছয় দফা কর্মসূচি দেওয়া হয়। এগুলো হলো– ১. ভারতের সঙ্গে সব চুক্তি উন্মোচন করতে হবে। অসম ও পরিবেশবিরোধী সব চুক্তি বাতিল করতে হবে; ২. ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বহমান নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে; ৩. দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে; ৪. গত ১৫ বছরে হিন্দু, বৌদ্ধসহ সব সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও ভূমি দখলের বিচার নিশ্চিত করতে হবে; ৫. পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য স্পষ্ট ভূমিকা নিতে হবে; ৬. অবিলম্বে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও মুখপাত্র সামান্তা শারমিন বক্তব্য দেন।
ছাত্র অধিকার পরিষদের মশাল মিছিল
একই ঘটনায় মশাল মিছিল করেছে ছাত্র অধিকার পরিষদ। গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি রাজু ভাস্কর্যে এসে শেষ হয়। মিছিলে ‘ভারতীয় আগ্রাসন, রুখে দাও জনগণ’, ‘দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা’সহ একাধিক স্লোগান দেওয়া হয়।
ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, নির্বাচনের আগে ভারত আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়েছিল। এখন তারা শেখ হাসিনাসহ তার সাথী-সঙ্গীদের জায়গা দিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের এখন দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হবে। একদিকে আওয়ামী লীগের দোসরদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, ভারতের উগ্রবাদী হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে। আমরা বারবার বলেছি, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু সরকার তা করেনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, নিজের চরকায় তেল দেন। আপনার দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন করা হচ্ছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবেন না।
বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল
বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী পাঠানো নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বক্তব্য রেখেছেন, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি বলে মনে করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অবিলম্বে এই ধরনের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব। সোমবার রাতে লন্ডন থেকে মুঠোফোনে গণমাধ্যমের কাছে দলের পক্ষ থেকে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ন হওয়া বা বিপন্ন হওয়ার যে অলীক কাহিনি ভারতীয় মিডিয়াগুলোতে প্রচারিত ও প্রকাশিত হচ্ছে, তা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা বারবার বলেছি, এখানে ভারতের সাংবাদিকরা এসেছিলেন, তারাও দেখেছেন বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি নেই। অথচ ভারতবর্ষের মিডিয়া ও তাদের নেতারা যেভাবে সম্পূর্ণ একটা মিথ্যা প্রচার করছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি দিচ্ছেন, তা কোনোমতেই বাংলাদেশের মানুষ গ্রহণ করবে না।
সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি– রিজভী
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ভিনদেশের একজন রাজনীতিবিদের এই প্রস্তাব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অবজ্ঞা ও অপমান করার শামিল। এটি একটি স্বাধীন দেশের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি। বাংলাদেশের জনগণ পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর এহেন বক্তব্যে বিস্মিত ও হতভম্ব।
গতকাল বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে একই কোরাসে অংশগ্রহণ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের স্বাধীন মর্যাদাকে অগ্রাহ্য করেছেন।
বাংলাদেশ নিয়ে অপপ্রচার বন্ধ করুন– হেফাজত
বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের গণমাধ্যম ও দেশটির রাজনীতিবিদদের অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো হস্তক্ষেপ থেকে দেশটিকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে গতকাল চট্টগ্রামে বিক্ষোভ মিছিল করেছে সংগঠনটি। এ সময় চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশনারের কাছে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তারা স্মারকলিপিও দেয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের মনগড়া তথ্য তুলে ধরে এ দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অপপ্রচার অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। এর আগে একই দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে হেফাজতে ইসলাম। নগরীর জমিয়তুল ফালাহ জামে মসজিদের সামনে থেকে এই মিছিল বের করা হয়। এতে হেফাজতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা অংশ নেন।
হাইকমিশনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ ভারতীয় পুলিশ– খেলাফত মজলিস
বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনায় নিন্দা ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে খেলাফত মজলিস। গতকাল এক বিবৃতিতে খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে একের পর এক মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। আজকে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে পুলিশের সামনে হামলা চালানো হয়েছে। এতে দূতাবাসের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। হামলাকারীরা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা করে ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আমরা ভারতীয় উগ্রবাদীদের এসব আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। কোনো সভ্য দেশে এ ধরনের বিদেশি দূতাবাসে হামলার ঘটনা ঘটতে পারে না। ভারতীয় পুলিশ বাংলাদেশ দূতাবাসের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
(নিজস্ব ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক এবং প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন।)
সম্পাদক: ডাঃ মির্জা মহিবুল হাছান, নির্বাহী সম্পাদক: মির্জা রকিবুল হাসান, সহকারী ব্যবস্থাপক: ফরিদুল আলম.
কার্যালয়: 70/E, Purana Paltan Line, 5th Floor, Dhaka-1000. নিউজ ও বিজ্ঞাপন : 01611507422 ইমেইল: bongosangbad.news@gmail.com, dailybongoshanbad@gmail.com
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বঙ্গ সংবাদ