আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে কারখানা আধুনিকায়নের কথা বলে আখ মাড়াই বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এবার সেই রংপুর চিনিকল আবার চালুর খবরে এলাকায় বইছে খুশির বন্যা। নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন শ্রমিকসহ আখচাষিরা।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত গাইবান্ধার একমাত্র কৃষিভিত্তিক ভারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রংপুর চিনিকল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রংপুর চিনিকল আধুনিকায়নের কথা বলে অর্নিদিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করা হয়। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের রাস্তাসহ ১৮৪২ একর জমি নিজেদের দাবি করে দখল করে রেখেছে ভুমি উদ্ধার কমিটি নামে দুটি সংগঠন। প্রতি বছর তারা এই জমি গুলো লিজ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বাগদা ফার্মের জমি লিজ নিতে প্রতি বিঘার জন্য গুনতে হচ্ছে বছরে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। সে হিসাব করলে ১৮৪২ একর জমি প্রতি বছর লিজ দেওয়া হচ্ছে পাঁচ কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকায়।
গত ১৫ ডিসেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপনে স্থগিত আদেশ প্রত্যাহারের সরকারি সিদ্ধান্তের একটি চিঠি সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এখবরে আখচাষীসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে খুশির আমেজ বইছে। এটি চালু হলে কর্মসংস্থান হবে হাজার হাজার মানুষের। এ জনপদের মানুষ নতুন করে দেখতে শুরু করেছেন সুদিনের স্বপ্ন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ ডিসেম্বর একটি চিঠি বাংলাদেশ সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব স্বাক্ষরিত স্মারকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন-এর অধীন মাড়াই স্থগিতকৃত চিনিকল সমূহে পুনরায় মাড়াই কার্যক্রম চালুকরণ শিরোনামের বিএসএফআইসি’র চেয়ারম্যান (গ্রেড-২) এর বরাবরে একটি পত্র প্রদান করা হয়। এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকার আখচাষীসহ সকল স্তরের মানুষের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতে শুরু করে।
অপর দিকে পূর্নরায় রংপুর চিনিকল চালুর খবরে ভুমিদস্যুরা হয়েছে তৎপর, চিনি কলের জমিতে আখচাষ করতে দিবে না দাবি তুলে করছে বিক্ষোভ । বাগদা ফার্মের জমিতে আবার আখ চাষ শুরু হলে তাদের অবৈধ ইনকাম বন্ধ হবে। তাই তারা এই জমি দখল নিতে গিয়ে যে তিন জন আদিবাসী সাওতাল নিহত হয়েছে তাদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত এই জমিতে কাউকে নামতে দেওয়া হবে না, ১৯ ডিসেম্বর সাহেবগঞ্জ ভুমি উদ্ধার কমিটি এই হুশিয়ারি দেন। তারা ফার্মের জমি নিজেদের দাবি করে বলেন আমাদের জমি আমাদের ফেরত দিতে হবে তা না হলে আগামী ১০ জানুয়ারী মহাসড়ক অবরোধের করাহবে। বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা বলেন আমাদের দাবি না মানা হলে বাগদা ফার্মের জমিতে আখ চাষ করতে দেওয়া হবে না।
রংপুর চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারী, আখচাষিসহ এলাকার লোকজন অভিযোগ করেন, ২০২০-২১ বার্ষিক আখ মাড়াই মৌসুম শুরুর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও সর্বোচ্চ মাড়াইক্ষমতা ও বিপুল পরিমাণ জমিতে দণ্ডায়মান আখ রেখে একেবারে শেষ মুহূর্তে মাড়াই বন্ধ করা হয়। সেই সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ আখচাষি ও শ্রমিক-কর্মচারীরা ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু তৎকালীন সরকার শ্রমিক আন্দোলন ও চাষিদের করুণ আকুতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ রাখে।
তারা বলেন, তখন আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারী ও চাষিদের উদ্দেশ্যে দেশের প্রায় সব জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রেসবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছিল, আধুনিকায়নের মাধ্যমে খুব দ্রুতই আবার চালু করা হবে এই চিনিকলসহ সব ক’টি চিনিকল। কিন্তু প্রায় এক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা এবং ৫০ হাজার চাষি ছাড়াও বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা অর্জনের মাধ্যম এই রংপুর চিনিকলটি চালু হয়নি গত পাঁচ বছরেও। বরং এ চিনিকলের স্থায়ী চাকরিজীবীদের একাংশ, গাড়ি, যন্ত্রাংশ ও নানা প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে চলমান অন্য চিনিকলে।
কাজ হারানো ‘কাজ নাই, মজুরি নাই’ (কানামনা) চুক্তিভিত্তিক প্রায় পাঁচশো শ্রমিক এখন পেটের দায়ে ভ্যান-রিকশা চালনাসহ বিভিন্ন কাজ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে চালু রাখা পার্শ্ববর্তী চিনিকলের চাইতে অধিক মাড়াই ক্ষমতাসম্পন্ন ও অধিক পরিমাণ আখ উৎপাদিত হলেও রহস্যজনক কারণে এ কলটি বন্ধ করায় বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এলাকার হাজার হাজার আখচাষিসহ সাধারণ মানুষ।
চিনিকল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, গত শতাব্দীর ৯০ এর দশকে তৎকালীন এরশাদ সরকারের শাসনামলে আধুনিকায়নের নামে কর্মকর্তাদের জন্য দামি গাড়ি-বাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স ও কারখানার কিছু সংস্কারের জন্য বিশ্বব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প সংস্থার আওতাধীন চিনিকলগুলোকে। এসব ঋণ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিনিকলগুলোর। রংপুর চিনিকলের বর্তমানে ৫০০ কোটি টাকা পুঞ্জীভূত লোকসানের প্রধান কারণ বিশ্ব ব্যাংকের এই ঋণ বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
গত চার বছর যাবত বন্ধ থাকায় ৩৫ একর আয়তনের কারখানার চত্বর ভরে গেছে জঙ্গলে। পরে থেকে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। খোলা আকাশের নিচে অযত্নে-অবহেলায় পড়ে থাকা আখ পরিবহনের যানবাহনগুলোও ধ্বংসাস্তুপে পরিনত হয়েছে। কারখানার ভেতরের দৃশ্যটাও একই রকম। কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতিতে এখন মরিচার আস্তরন। থমকে আছে হাজারো মানুষের জীবিকার চাকা। আখচাষী আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিত্যদিনের সমাবেশের চিরচেনা দৃশ্য আর নেই। হাজারো মানুষের একসময়ের জীবন-জীবিকার কেন্দ্রস্থলের প্রবেশপথ ও মিলে আখ সরবরাহের জন্য শত শত সারিবদ্ধ গাড়ির বিশাল প্রাঙ্গণটি এখন গো-চারণভূমি। উপজেলা বাসীর স্বপ্ন আবারো চালু হবে রংপুর চিনিকল এবং উদ্ধার হবে ১৮৪২ একর বেদখলে যাওয়া জমি চাষ হবে আখ এবং উৎপাদন হবে চিনি।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৫৪ সালে তৎকালীন রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহুকুমার গোবিন্দগঞ্জ থানার মহিমাগঞ্জে শুরু হয় রংপুর চিনিকলের নির্মাণকাজ। ২৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে তিন বছর পর শেষ হয় মিলটির নির্মাণ কাজ। ১৯৫৭-৫৮ মৌসুম থেকেই আখ মাড়াইয়ের মাধ্যমে চিনি উৎপাদন শুরু হয় মিলটিতে। পশ্চিম জার্মানীর বাকাউ-উলফ নামের একটি কোম্পানি থেকে আনা মেশিনে ৩৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠে মিলের কারখানা ও কার্যালয়। ১৯৭২ সালে রংপুর চিনিকলসহ সব চিনিকলকে রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এ চিনিকলের কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। পুকুরসহ রেলওয়ে সাইডিংয়ের জায়গা ৮ একর, সাড়ে ১৪ একর জায়গায় গড়ে ওঠে ৫০টি ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্র এবং ৮টি সাবজোন। এছাড়াও মিলের নিজস্ব খামারের জমির পরিমাণ ১ হাজার ৮৩২ একর। ১৯৫৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৬৩ বছরে ২২ হাজার ৯৮৫ দিনের মধ্যে ৫ হাজার ৭৩৯ দিন ঘোরে মিলের চাকা। এ সময়কালে ৫৬ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে উৎপাদন করা হয় ৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন চিনি।
রংপুর চিনিকলের ছিল নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা। এখানকার পাওয়ার হাউজে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হতো। চিনিকলের আখ পরিবহনের জন্য ছিল নিজস্ব রেলপথ। সেই রেলপথে নিজস্ব রেলের ইঞ্জিন ও মালবাহী বগি দিয়ে পরিবহন করা হতো আখ, চিনি, চিটাগুড় ও জ্বালানিসহ নানা দ্রব্য।
রংপুর চিনিকলকে ঘিরে জাঁকজমক ছিল মহিমাগঞ্জ রেলস্টেশন। বিখ্যাত বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে মহিমাগঞ্জ। শিক্ষার প্রসারেও অন্যতম ভূমিকা রাখে রংপুর চিনিকল উচ্চ বিদ্যালয়। সবকিছু মিলিয়ে চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারী, আখচাষিসহ অসংখ্য মানুষের আয়-রোজগারের পথ সৃষ্টি করেছিল রংপুর চিনিকল।
রংপুর চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ান সুজা বলেন, দেশের কৃষক-শ্রমিকদের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে বিগত স্বৈরাচারী সরকার রাষ্ট্রায়াত্ত চিনিশিল্প বন্ধ করে দেওয়ার গভীর চক্রান্ত করেছিল। চিনিকলটি বন্ধ হয়ে থাকায় এই জনপদের সকল স্তরে অন্ধকার নেমে এসেছে। বর্তমান সরকার অসাধু সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্রের এই জাল ছিন্ন করে পুনরায় চিনিকলটি আধুনিকায়নের মাধ্যমে চালু করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা খুবই বাস্তবসম্মত। আমরা একে স্বাগত জানাই।
মিলস গেট সাবজোনের আখচাষি ফেরদৌস আলম অভিযোগ করে বলেন, রংপুর চিনিকলের চাইতে অনেক কম মাড়াই ক্ষমতাসম্পন্ন জয়পুরহাট চিনিকলের আখ জোন এলাকায় আখও উৎপাদন হয় কয়েক গুণ কম। তারপরও ওই মিলটি চালু রেখে ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের রংপুর চিনিকলের আখ এবং ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরের শ্যামপুর চিনিকলের আখ জয়পুরহাটে পরিবহন করতে অতিরিক্ত ব্যয় করার মাধ্যমে এ শিল্পটি চিরতরে বন্ধ করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। বন্ধ চিনিকলগুলো পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই।
রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ইনচার্জ) মাসুমা আকতার জাহান জাগো নিউজকে বলেন, রংপুর চিনিকলসহ মাড়াই স্থগিতকৃত ছয়টি চিনিকল পুনরায় চালুর বিষয়টি আমিও শুনেছি। আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই চিনিকলটি চালু হলে অবশ্যই লাভজনক অবস্থায় উন্নীত হবে। কারণ এখানকার মাটি ও পরিবেশ আখচাষের জন্য খুবই উপযোগী।
সম্পাদক: ডাঃ মির্জা মহিবুল হাছান, নির্বাহী সম্পাদক: মির্জা রকিবুল হাসান, সহকারী ব্যবস্থাপক: ফরিদুল আলম.
কার্যালয়: 70/E, Purana Paltan Line, 5th Floor, Dhaka-1000. নিউজ ও বিজ্ঞাপন : 01611507422 ইমেইল: bongosangbad.news@gmail.com, dailybongoshanbad@gmail.com
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বঙ্গ সংবাদ