শিবগঞ্জে সারের জন্য কৃষকদের হাহাকার, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৩:২৪:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
- / ২০৫৭ বার পড়া হয়েছে
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে সারের জন্য কৃষকদের দুর্ভোগ কিছুতেই কমছে না। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও চড়া দামে সার বিক্রির অভিযোগে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। রবি মৌসুমে ভুট্টা ও সরিষা চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করেও সময়মতো ডিএপি (DAP) ও অন্যান্য সার না পাওয়ায় বীজ বপন করতে পারছেন না অনেকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি রাতভর লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাঁদের।
অন্যদিকে, উপজেলা কৃষি বিভাগের দাবি, উপজেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। কিছু কৃষকের আগাম সার মজুত রাখার প্রবণতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ।
সারারাত লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরছেন কৃষক
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দিনব্যাপী উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর, শ্যামপুর, দাইপুখুরিয়া ও কানসাটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের তীব্র ক্ষোভ ও দুর্ভোগের চিত্র দেখা যায়।
মনাকষা ইউনিয়নের ঈদগাহ মোড়ে সার কিনতে আসা সুফিয়া বেগম জানান, দুই বিঘা জমিতে ভুট্টা ও সরিষা চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করেছেন তিনি। কিন্তু সকাল থেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সার পাননি।
৮৮ বছর বয়সী কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “শেষ বয়সে এক বস্তা ডিএপি সারের জন্য রাত ৩টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, সার নেই।”
একই চিত্র দেখা গেছে মনাকষা বাজারের অগ্রণী ব্যাংকের নিচে আকবর মিয়ার গুদামের সামনে। সেখানে ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় এক হাজার কৃষক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে জানা গেছে।
ভোর ৪টা থেকে অপেক্ষায় থাকা কৃষক মাসিদুর রহমান ও সুমন জানান, ১০ থেকে ২০ বিঘা জমিতে আবাদ করার জন্য তাঁদের প্রচুর সার প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
সিন্ডিকেট ও দালাল চক্রের দাপটের অভিযোগ
কৃষকদের অভিযোগ, সার বিতরণে কিছু ডিলার ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির সমন্বয়ে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাঁদের দাবি, ডিলারদের ব্যবস্থাপকদের যোগসাজশে দালালদের মাধ্যমে শুরুতেই ১০ থেকে ১২ বস্তা করে সার সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে সাধারণ কৃষকরা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না।
এ ছাড়া চড়া দামে বস্তাপ্রতি ২ হাজার ১০০ টাকা দিয়ে অবৈধভাবে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কৃষক।
সার না পেয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হলেও ডিলারদের অনুপস্থিতিতে কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
সারের সংকট নেই, দাবি কৃষি বিভাগের
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি রবি মৌসুমে শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ২৮ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ হচ্ছে। এ বিপুল পরিমাণ জমিতে চাষাবাদ নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিভাগটি।
সারসংকট ও সিন্ডিকেটের অভিযোগের বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া বলেন, “উপজেলায় সারের কোনো প্রকৃত সংকট বা সিন্ডিকেট নেই। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি জানান, শুধু নভেম্বর মাসের জন্য উপজেলায় ১ হাজার ২৭৭ মেট্রিক টন ডিএপি, ৫০ মেট্রিক টন এমএপি, ২০৪ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ রয়েছে।
অবৈধ সার বিক্রি রোধে অভিযান
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, অবৈধভাবে সার বিক্রি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির প্রবণতা ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গত দুই মাসে ৭ থেকে ৮টি অভিযান চালিয়ে প্রায় সোয়া তিন লাখ টাকা মূল্যের দুই শতাধিক বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
দ্রুত কৃষি কার্ড বিতরণ সম্পন্ন হলে সার বিতরণে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।
তবে কৃষকদের অভিযোগ ও কৃষি বিভাগের বক্তব্যের মধ্যে দেখা দিয়েছে স্পষ্ট ব্যবধান। একদিকে কৃষকরা সময়মতো সার না পাওয়ায় ফসলের আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, পর্যাপ্ত সার মজুত ও বরাদ্দ রয়েছে। এ অবস্থায় সারের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা, অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করা এবং প্রকৃত কৃষকদের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।





















