ঢাকা ০২:২৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
চিকিৎসকদের সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির এনসিপির নতুন সংগঠন ‘ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্স’, নেতৃত্বে ফাহিম ও নাজমুল সকালে ঘুম থেকে উঠেই মাথাব্যথা? স্ট্রোকের এই ৫ লক্ষণ অবহেলা করবেন না রেসিং সান্তান্দারকে ৩-০ গোলে হারিয়ে রিয়ালের টানা ষষ্ঠ জয় কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠকে যোগ দিতে ঢাকা ছাড়লেন হুমায়ুন কবির পুতিনকে ‘বাস্তব জীবনের বন্ড ভিলেন’ ও ‘শয়তান’ বললেন কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী পোশাকশিল্পে অস্থিরতা ঠেকাতে উৎপাদন অব্যাহত রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর অপপ্রচারের অভিযোগ তুলে ফেনীতে বিএনপি নেতা লিংকনের সংবাদ সম্মেলন জামালপুরে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয় যুব দিবস – ২০২৬ উদযাপিত বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় যুব দিবস উদযাপন ময়মনসিংহে

সম্ভাবনাময় মৎস্য খাতে অবহেলা, জনবল ও পরিবহন সংকটে শ্যামনগর মৎস্য অধিদপ্তর


সেলিম আহম্মেদ,জেলা ব্যুরো প্রধান, সাতক্ষীরা
  • আপডেট সময় : ০১:৩২:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / ২০৬৪ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা দেশের উপকূলীয় মৎস্য উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। বাগদা ও গলদা চিংড়ি, সাদা মাছ এবং কাঁকড়া চাষের জন্য পরিচিত এ উপজেলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল মৎস্য অর্থনীতি। সুন্দরবন ও নদ-নদীঘেঁষা এ অঞ্চলে সরকারি হিসাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার ৯২৮ জন। স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়, উপজেলার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ, চিংড়ি ও সাদা মাছের ঘের পরিচালনা এবং মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

সাতক্ষীরা জেলা থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাছ ও চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে শ্যামনগর থেকে। এ খাত দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ এত বড় একটি মৎস্যনির্ভর অঞ্চলে মৎস্য খাতের তদারকি ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনাকারী উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি, সরকারি যানবাহনের অপ্রতুলতা ও পরিবহনসংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি এবং দ্রুত সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মৎস্যচাষি, জেলে ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে ঘের ও মৎস্য উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে অনিয়ম শনাক্ত করা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা জরুরি।

অন্যদিকে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মাছের ওজন ও আকার বাড়াতে ক্ষতিকর উপাদান প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে, যা স্থানীয় মৎস্য খাতের সুনাম এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মানের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে কার্যকর মাঠপর্যায়ের তদারকি প্রয়োজন। কিন্তু জনবল ও পরিবহনসংকটের কারণে যথাসময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে সেবা নিতে দূরদূরান্ত থেকে মৎস্যচাষি ও সাধারণ মানুষকে মৎস্য অফিসে আসতে হয়। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষার মুখেও পড়তে হয় তাঁদের। ইউনিয়নভিত্তিক নির্দিষ্ট দিনে মৎস্যসেবা প্রদান, নিয়মিত পরামর্শ কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রশিক্ষণ স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া গেলে এ ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

মৎস্য খাতের উন্নয়নে সরকারি প্রকল্প, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং চাষিদের প্রশিক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্যামনগরে এ ধরনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম ও প্রকল্পের দৃশ্যমানতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে বিপুল সম্ভাবনাময় এ খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মৎস্যচাষিদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে তাঁদের আশঙ্কা।

এ অবস্থায় শ্যামনগর উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, সচল ও পর্যাপ্ত সরকারি যানবাহন নিশ্চিত করা, নিয়মিত মাঠপর্যায়ে অভিযান ও তদারকি জোরদার করা এবং ইউনিয়নভিত্তিক সেবা চালুর দাবি উঠেছে। পাশাপাশি মৎস্যচাষি ও জেলেদের জন্য বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্যামনগরের মৎস্য খাত শুধু স্থানীয় মানুষের জীবিকার উৎস নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এ খাতের সুরক্ষা, মান বজায় রাখা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। যথাযথ জনবল, পরিবহন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শ্যামনগরের মৎস্য খাত আরও সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি জেলে, চাষি ও সাধারণ মানুষও প্রত্যাশিত সেবা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

× Advertisement

সম্ভাবনাময় মৎস্য খাতে অবহেলা, জনবল ও পরিবহন সংকটে শ্যামনগর মৎস্য অধিদপ্তর

আপডেট সময় : ০১:৩২:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা দেশের উপকূলীয় মৎস্য উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। বাগদা ও গলদা চিংড়ি, সাদা মাছ এবং কাঁকড়া চাষের জন্য পরিচিত এ উপজেলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল মৎস্য অর্থনীতি। সুন্দরবন ও নদ-নদীঘেঁষা এ অঞ্চলে সরকারি হিসাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার ৯২৮ জন। স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়, উপজেলার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ, চিংড়ি ও সাদা মাছের ঘের পরিচালনা এবং মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

সাতক্ষীরা জেলা থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাছ ও চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে শ্যামনগর থেকে। এ খাত দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ এত বড় একটি মৎস্যনির্ভর অঞ্চলে মৎস্য খাতের তদারকি ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনাকারী উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি, সরকারি যানবাহনের অপ্রতুলতা ও পরিবহনসংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি এবং দ্রুত সেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মৎস্যচাষি, জেলে ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে ঘের ও মৎস্য উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে অনিয়ম শনাক্ত করা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা জরুরি।

অন্যদিকে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মাছের ওজন ও আকার বাড়াতে ক্ষতিকর উপাদান প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে, যা স্থানীয় মৎস্য খাতের সুনাম এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মানের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে কার্যকর মাঠপর্যায়ের তদারকি প্রয়োজন। কিন্তু জনবল ও পরিবহনসংকটের কারণে যথাসময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে সেবা নিতে দূরদূরান্ত থেকে মৎস্যচাষি ও সাধারণ মানুষকে মৎস্য অফিসে আসতে হয়। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষার মুখেও পড়তে হয় তাঁদের। ইউনিয়নভিত্তিক নির্দিষ্ট দিনে মৎস্যসেবা প্রদান, নিয়মিত পরামর্শ কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রশিক্ষণ স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া গেলে এ ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

মৎস্য খাতের উন্নয়নে সরকারি প্রকল্প, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং চাষিদের প্রশিক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্যামনগরে এ ধরনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম ও প্রকল্পের দৃশ্যমানতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে বিপুল সম্ভাবনাময় এ খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মৎস্যচাষিদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে তাঁদের আশঙ্কা।

এ অবস্থায় শ্যামনগর উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, সচল ও পর্যাপ্ত সরকারি যানবাহন নিশ্চিত করা, নিয়মিত মাঠপর্যায়ে অভিযান ও তদারকি জোরদার করা এবং ইউনিয়নভিত্তিক সেবা চালুর দাবি উঠেছে। পাশাপাশি মৎস্যচাষি ও জেলেদের জন্য বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্যামনগরের মৎস্য খাত শুধু স্থানীয় মানুষের জীবিকার উৎস নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এ খাতের সুরক্ষা, মান বজায় রাখা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। যথাযথ জনবল, পরিবহন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শ্যামনগরের মৎস্য খাত আরও সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি জেলে, চাষি ও সাধারণ মানুষও প্রত্যাশিত সেবা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।