বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট
সুক্ষ পরিকল্পনায় প্রকৌশলীর অভিনব দুর্নীতি
- আপডেট সময় : ০৩:৪৪:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / ২২৩৪ বার পড়া হয়েছে
🔴 ৬ হাজার ৮৭০ টাকা’র রং; ব্যবহার (রং করণে) ব্যয় ৪৯ হাজার ৩২০ টাকা।
🔴 প্রতিষ্ঠানে নেই শহিদ মিনার তবুও করেছেন শহিদ মিনারের ফ্লোর এবং যাতায়াতের রাস্তা ঢালাই।
🔴 আরসিসি রাস্তার এস্টিমেটে প্লাস্টার, গ্লাস (কাচ), লোহার অ্যাঙ্গেল, এনামেল পেইন্ট ক্রয় ও রং করণ।
🔴 পৌনে ৩ কোটি টাকার কাজে সাড়ে ৬১ লাখ আত্নসাৎ।
দুর্নীতি করতে সুক্ষ পরিকল্পিনা করে ‘রোডম্যাপ’ করা হয় দুইটি রাস্তা নির্মাণ কাজের এস্টিমেটে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এস্টিমেটে বেশকিছু ‘অপ্রাসঙ্গিক’ আইটেম যুক্ত করা হয়। এরপর টেন্ডার শেষে কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারের মাধ্যমে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ আইটেমের ব্যয় দেখিয়ে বিল উত্তোলন করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। দুর্নীতির এমন অভিনব কৌশল করেছেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম।
১ কোটি ৪৪ লক্ষ ৮ হাজার ৩৬৫ টাকা চুক্তিতে ২০২৪ সালের মে মাসে শামীম এন্টারপ্রাইজ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একটি আরসিসি রাস্তা নির্মাণ কার্যাদেশ দেয় ‘পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’ পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার এবং ১ কোটি ৪৪ লক্ষ ৮ হাজার ৩৬৫ টাকা চুক্তিতে ২০২৪ সালের ১০ জুন মেসার্স আতিক এন্টারপ্রাইজ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ভিন্ন আরেকটি আরসিসি রাস্তা নির্মাণের কার্যাদেশ দেয় মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক ড. গৌতম কুমার দেব।
আশরাফুল, পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পের আরসিসি রাস্তা নির্মাণ কাজের এস্টিমেটে কোনো এক অজ্ঞাত ভবনের নিচ তলায় ৬২৫ বর্গফুট ইটের গাঁথুনীর ব্যয় ধরেছেন ৭ লক্ষ ৮৮হাজার ৪৮০ টাকা, ৯১৪ বর্গফুট আরসিসি প্লাস্টারের (ভবনের ওয়াল) ব্যয় ধরেছেন ২৫ হাজার ৫৮৫ টাকা ও ১৪৮৩ ঘনফুট ১৫ইঞ্চি ইটের গাথুনী বাবদ ৩ লক্ষ ৮৩ হাজার ৮৮০ টাকা। এসব অপ্রাসঙ্গিক আইটেমের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে, ১১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৯৪৫ টাকা। এছাড়া মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণ কাজের এস্টিমেটে ১৯মিলিমিটার উচ্চতার ১৮৩ বর্গফুট গ্লাস ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ৫ হাজার ১১৭ টাকা, ১ হাজার ৪৫২ বর্গফুট ৬ মিলিমিটার (ওয়াল) প্লাস্টার বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ হাজার ৬৩৫ টাকা, ৩ হাজার ৯৬০ বর্গফুট জায়গায় ১২ মিলিমিটার প্লাস্টার বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লক্ষ ৪০ হাজার ২০৮ টাকা। আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, ৬ হাজার ৮৭০ টাকা রং, রং করণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩২০ টাকা। এবং রাস্তায় ব্যবহারের জন্য ১ হাজার ৭৮০ কেজি স্টিলের চ্যানেল/অ্যাঙ্গেল বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৬২০ টাকা। অর্থাৎ, মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণ কাজে অপ্রাসঙ্গিক মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লক্ষ ৭১ হাজার ৭৭০ টাকা। এভাবে তিনি দুইটি রাস্তা নির্মাণে অপ্রাসঙ্গিক আইটেমের ব্যয় দেখিয়ে ১৬ লক্ষ ৬৯ হাজার ৭১৫ টাকা আত্নসাৎ করেন। এছাড়াও শহীদ মিনারের ফ্লোর এবং শহীদ মিনারে যাতায়াতের জন্য ১০২৪ ঘনফুট ঢালাই ও ৬৯৯ বর্গফুট সাটারিং বাবদ মোট ব্যয় দেখিয়েছেন ৩ লক্ষ ৩৯ হাজার ৮০ টাকা। অথচ বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে কোনো শহীদ মিনার নেই।
দুইটি রাস্তা নির্মাণ কাজের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য প্রাপ্তির আবেদন করে এ প্রতিবেদক। প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হলে এসব দুর্নীতির ভয়ংকর কৌশল বেরিয়ে আসে।
জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগ-১ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, রাস্তার কাজের এস্টিমেটে ১৫ ইঞ্চি গাথুনী, প্লাস্টার, গ্লাস (কাচ), এনামেল পেইন্ট এবং রংকরণের আইটেমগুলো কোনভাবেই যুক্ত করতে পারে না। বিষয়টি হাস্যকর। যদি কেউ আরসিসি রাস্তার এস্টিমেটে এসব অপ্রাসঙ্গিক আইটেম যুক্ত করে থাকেন তাহলে তার (প্রকৌশলীর) অসৎ উদ্দেশ্যে এটি পরিস্কার। কারণ এসব মালামাল তার প্রয়োজন হলে আলাদা টেন্ডার বা কোটেশনের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে পারতেন।
দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএলআরআই-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, নির্মাণ কাজে দুর্নীতি করা হলে এর জবাব আমি আমার প্রতিষ্ঠান প্রধানকে দেবো। কোনো সাংবাদিককে জবাবদিহিতা করতে আমি বাধ্য নই।
বিএলআরআই সূত্রে জানা যায়, গত আট বছরে বিএলআরআই এর অধীনে যে সকল নির্মাণ ও সংস্কার কাজ হয়েছে প্রতিটি কাজেই তিনি এমন কৌশল করে বিপুল পরিমান সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তবে, এসব অর্থ লুটপাট করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক, প্রকল্পের ডিপিডি এবং নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রকৌশল বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তারা যুক্ত রয়েছে। যার ফলে নির্মাণ কাজের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয় বাহিরে প্রকাশ পায় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পের এক কর্মকর্তা জানায়, এই রাস্তাটির অধিকাংশ জায়গা সমতল আবাদি জমির উপর দিয়ে করা হয়েছে। শুধু পোল্ট্রি সেডের কাছ থেকে রাস্তার মোড় পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকার মাটি ভরাট করতে হয়েছে। আর বাকি জমি ছিলো সমতল। এই টুক মাটি কেটে আনতে ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০ টাকা ব্যয় কিভাবে হয়? এটা আমারও প্রশ্ন। সমতল জমির দুই পাশে গাইড ওয়াল করে বালু ভরাট করা হয়েছে মাত্র ৫ লক্ষ টাকার অথচ বিল করা হয়েছে ৯ লক্ষ ৪১ হাজার ১২০ টাকা। এ বিষয়ে একটি দক্ষ প্রকৌশলীর মাধ্যমে তদন্ত করা হলে তার দুর্নীতির পরিমাপ সঠিকভাবে জানা যেত। এছাড়া তিনি সাইট অফিস নির্মাণ ব্যয় ৫০ হাজার ৩০৮ টাকা, সাইন বোর্ড ব্যয় ৭২৮৭ টাকা, লেআউট ও বক্স কাটার জন্য ব্যয় ৪৮ হাজার ৬০০, ঘাস লাগানোর ব্যয় ৬৪ হাজার ১৭০ টাকা, ইটের সলিং তুলে নতুন করে স্থাপনের নামে ৩৩ হাজার ৩৬০ টাকা, হেরিং বন্ডের নামে ২৮ হাজার ৮০ টাকা আত্নসাৎ করেছেন।
এস্টিমেট পর্যালোচনা করে দেখায়ায়, ৩৯ টন রডের মূল্য ধরা হয়েছে ৪৭ লক্ষ ১৯ হাজার টাকা। অথচ রডের বাজার মূল্য ৯২ টাকার উপর ভ্যাট যুক্ত করলে মোট টাকার পরিমান আসে ৪১ লক্ষ ২৬ হাজার ২০০টাকা। এই হিসেব অনুযায়ী রডের মূল্যে ঘাপলা করে তিনি ৫ লক্ষ ৯২হাজার ৮০০ টাকা আত্নসাৎ করেন। এছাড়া, ৬ ইঞ্চির স্থলে রডের গ্যাপ ৮ ইঞ্চি করে অন্তত ৪ টন রড কম ব্যবহার করা হয়েছে। এস্টিমেটের দর অনুযায়ী যার মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
রাস্তা ঢালাইয়ে চুরি : মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের ‘মহিষ সেডে’র অভ্যন্তরে ৭ টি স্থানে ১০ হাজার ৯৪৮ ঘনফুট আরসিসি ঢলাই করার দাবি করা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে পরিমাপ করে দেখা যায়, ৭টি স্থানে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার ঘনফুট ঢালাই করা হয়েছে। এভাবে তিনি (প্রকৌশলী) ৬ হাজার ৪ শত ৪৮ ঘটফুট ঢালাই না করে ২৯৬ টাকা ঘটফুট অনুযায়ী ১৯ লক্ষ ৮ হাজার ৬০৮ টাকা। এভাবে তিনি দুইটি রাস্তা নির্মাণ কাজের বরাদ্দ ২ কোটি ৭১ লক্ষ ৬২ হাজার ২৮২ টাকা থেকে অন্তত ৬১ লক্ষ ৩৫ হাজার ১৫৮ টাকা আত্নসাৎ করেন। এই হিসেবে বরাদ্দের ২৩ শতাংশ টাকা আত্নসাৎ করা হয়।
রাস্তার এস্টিমেটে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ আইটেম যুক্ত করা এটি দুর্নীতির সুক্ষ পরিকল্পনা কি না? জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. শাকিলা ফারুক যুগান্তরকে বলেন, যদি এস্টিমেটে এসব অপ্রাসঙ্গিক আইটেমগুলো উল্লেখ থাকে তাহলে দুর্নীতির সুক্ষ পরিকল্পনার বিষয়টি বলা যেতে পারে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে নির্মাণ কাজে অনিয়মের বিষয়টিও ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে, কিনচিৎ দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

























