গাজায় সেনা পাঠিয়ে ট্রাম্পকে খুশি করতে গিয়ে কোন ঝুঁকিতে পড়তে পারে পাকিস্তান?
- আপডেট সময় : ০১:১৪:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫
- / ২১০১ বার পড়া হয়েছে
গাজায় সংঘাত বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনায় গত সোমবার অনুমোদন দিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। তবে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি পাকিস্তান এখনো এ বিষয়ে নিজেদের চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট করেনি।
সেদিন নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের পক্ষে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম ইফতেখার আহমেদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তাবটি উত্থাপনের জন্য ধন্যবাদ জানালেও উল্লেখ করেন, পাকিস্তানের দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ চূড়ান্ত খসড়ায় রাখা হয়নি। এতে তারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন বলেও জানান তিনি।
প্রস্তাবে গাজায় একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) গঠনের কথা বলা হয়েছে। বহুজাতিক এই বাহিনী গাজার নিরাপত্তা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বেসামরিক সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং উপত্যকাটিকে অস্ত্রমুক্ত রাখতে কাজ করবে। তবে বাহিনীতে কোন দেশ সেনা পাঠাবে, বিওপি (বোর্ড অব পিস)–এর কাঠামো কী হবে কিংবা জাতিসংঘের ভূমিকা কী—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রস্তাবে নেই।
আসিম ইফতেখার বলেন, প্রস্তাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথের প্রতিশ্রুতি থাকলেও সেই পথ সম্পর্কে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, আইএসএফের গঠন ও গাজার প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে স্পষ্টতা ছাড়া এ উদ্যোগ সফল করা কঠিন হবে।
ভৌরাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানের গুরুত্ব বৃদ্ধি
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর ইসলামাবাদ সফর, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের জর্ডান–মিসর সফর এবং গাজা যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিকতায় পাকিস্তানের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে দেশটির ভূমিকা আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ১৯৬৭–পূর্ব সীমান্তের ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতেও আগ্রহী। গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত প্রতিরক্ষাচুক্তিও এ প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।
আইএসএফে অংশগ্রহণ—কথা সহজ, বাস্তবায়ন কঠিন
পাকিস্তানে ফিলিস্তিন ইস্যু অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশটি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না, এমনকি পাসপোর্টে ইসরায়েল সফর নিষিদ্ধ উল্লেখ রয়েছে। তাই গাজায় সামরিক মোতায়েন বা ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সমন্বয় পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ আইএসএফে অংশগ্রহণকে পাকিস্তানের জন্য ‘গর্বের বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করলেও সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পার্লামেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন, বিওপি ও আইএসএফের কাঠামো নিয়ে প্রস্তাবে অসংখ্য অস্পষ্টতা রয়েছে। চীন ও রাশিয়া এ কারণেই ভোটদান থেকে বিরত থেকেছে।
সম্ভাবনা, বাধা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি
মার্কিন সূত্র অনুযায়ী, পাকিস্তান, আজারবাইজান ও ইন্দোনেশিয়া আইএসএফে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত বলেছে, আইনি কাঠামো স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তারা বাহিনীতে যোগ দেবে না।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। দেশটির অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় এড়ানো প্রায় অসম্ভব—যা পাকিস্তানের জনমনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওমর মাহমুদ হায়াত বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় নৈতিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই পাকিস্তানের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
তবে অন্যদের মতে, আইএসএফ একটি জোট বাহিনী হবে এবং সমন্বয়ের দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট অংশীদারও নিতে পারে, ফলে পাকিস্তানকে সরাসরি ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে কাজ করতে নাও হতে হতে পারে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের সারসংক্ষেপ—গাজায় সেনা পাঠানো পাকিস্তানের জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক হতে পারে, তবে রাজনৈতিক ঝুঁকি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জটিল।



























