সিদ্ধান্তহীন ভোটাররাই হবে কিংমেকার—বিভিন্ন জরিপে এমন পূর্বাভাস
- আপডেট সময় : ১২:৫০:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২০৯৮ বার পড়া হয়েছে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১৮ দিন বাকি। নির্বাচনের মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন দুই জোটের মুখোমুখি অবস্থান দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনি সমীকরণকে করে তুলেছে আরও অনিশ্চিত। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, এখনো প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ ভোটার সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটারদের অবস্থানই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ‘তুরুপের তাস’। সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের একটি বড় অংশ এই ভোটব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অতীতের জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কখনো ৪০ শতাংশের নিচে নেমেছে, আবার কখনো ৮৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এমন বাস্তবতায় মাত্র ১০ শতাংশ ভোটই জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। ফলে এই ভোটারদের কেন্দ্রে আনা ও নিজেদের পক্ষে টানাই এখন ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য।
মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের কাছে পৌঁছাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিভিন্ন দল ও জোট। মামলা ও গ্রেপ্তার থেকে রক্ষার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কুমিল্লা, ভোলা, চুয়াডাঙ্গা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী-সমর্থকের বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ‘স্টার নির্বাচনি সংলাপ’-এ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের বাক্সে নিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং এ লক্ষ্যে মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোও এই টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইনোভিশন কনসালটিং পরিচালিত এক জরিপে আওয়ামী লীগের প্রতি ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশ সমর্থন পাওয়া গেলেও নির্বাচনে দলটির অনুপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর ভোটারদের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, আসন্ন নির্বাচনে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে, ১৯ শতাংশ জামায়াতকে এবং ২ দশমিক ৬ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দিতে আগ্রহী। একই জরিপে আওয়ামী লীগের ভোটারদের মধ্যে ৬০ শতাংশ বিএনপির প্রতীকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এর এক সপ্তাহ পর, ১২ জানুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি (আইআইএলডি) প্রকাশিত আরেকটি জরিপে দেখা যায়, ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপিকে, ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ জামায়াতকে, ৭ দশমিক ১ শতাংশ এনসিপিকে এবং ৩ দশমিক ১ শতাংশ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ভোট দিতে চান। ওই জরিপে ১৭ শতাংশ ভোটারকে এখনো সিদ্ধান্তহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের বড় অংশ আওয়ামী লীগপন্থি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, ‘পাঁচ বা দশটি ভোটেও জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতে পারে। সেখানে ১৭ শতাংশ সিদ্ধান্তহীন ভোটার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ভোট না-ও দিতে পারেন, ব্যালট নষ্ট করতে পারেন কিংবা বিকল্প প্রার্থী বেছে নিতে পারেন। বিশেষ করে কট্টর আওয়ামী সমর্থকদের একটি অংশ ভোটদানে বিরত থাকার আভাস দিচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর কোন দল রাজনৈতিক সংস্কারে কতটা আন্তরিক ছিল, পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে কি না এবং তাদের সামগ্রিক আচরণ কেমন ছিল—এসব বিষয়ও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে। কোন দল বা প্রার্থী এই ভোট পাবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে স্থানীয় রাজনীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর। যারা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছে, তারা সেই দল বা প্রার্থীকেই বেছে নিতে পারেন। তবে এলাকাভেদে এই চিত্র ভিন্ন হতে পারে।’


























