গণঅভ্যুত্থানের নারীরা কোথায়?
- আপডেট সময় : ১২:২৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৪
- / ২১০৬ বার পড়া হয়েছে
গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে। আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, ব্যাপকসংখ্যক নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কোনো কোনো জায়গায় তারা গণহত্যাকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ অন্যদের বিরুদ্ধে লড়াকু অবস্থান নেন। উপস্থিতির ব্যাপকতার দিক থেকে এই চিত্র দেশের ইতিহাসের যে কোনো আন্দোলন ছাপিয়ে গেছে। এবারের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নারীর রাজনৈতিক কর্তাসত্তা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দারুণভাবে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে নারীরা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। যেমন সম্প্রতি গঠিত দল বা কমিটিগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ নগণ্য। জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে যেসব সভা, সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেখানেও তাদের শরিকানা সন্তোষজনক নয়। এই পরিস্থিতি আগামী দিনের নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েমে কতটা ইতিবাচক?
জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রধানত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কমিটিগুলোতে নারীর যুক্ততা হতাশাজনক। অথচ অভ্যুত্থানে বিপুল ছাত্রী ও কর্মজীবী নারী অংশগ্রহণ করেন। কোথাও কোথাও তারা নেতৃত্ব দিয়ে আন্দোলনকারীদের সংগঠিত করেছেন। অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই ছিলেন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এ সময় দুর্দান্ত সংহতি গড়ে ওঠে। যখন ফ্যাসিবাদী সরকারের পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ শিক্ষার্থীদের ওপর পৈশাচিক সহিংসতা চালাচ্ছিল, তখন ছাত্র ও তরুণদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে নারীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একজন তরুণী একাই যেভাবে প্রিজন ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে প্রতিরোধের অভাবনীয় সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন, সেই চিত্র রীতিমতো ‘ভাইরাল’ হয়ে গিয়েছিল। কেবল ভাইরাল হওয়া নয়; দেশে ও বিদেশে অনেককে সাহসও জুগিয়েছে ওই আলোকচিত্র। আন্দোলনে এ রকম বহু বীরত্বগাথার চিত্র আমরা দেখেছি।
দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করতে গিয়ে নারীরা ভয়াবহ নিপীড়ন ও নিষ্ঠুরতারও শিকার হয়েছেন। ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগ ক্যাডাররা যে সহিংসতা চালিয়েছে, তা আমরা সংবাদমাধ্যমসহ অন্যান্য পরিসরে দেখেছি। তবুও নারীরা পিছপা না হয়ে এগিয়ে গেছেন। অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ব্যান্ডেজসহ আন্দোলনে পুনরায় যুক্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর ধীরে ধীরে তাদের তৎপরতায় ভাটা পড়ল কেন?
যে কোনো আন্দোলন ও লড়াইয়ে সর্বস্তরের মানুষের সংহতি ও প্রতিরোধ যেমন জরুরি, তেমনিভাবে দরকার নিজেদের পুনর্গঠন। অভ্যুত্থানের পর সর্বস্তরের নাগরিকদের নিয়ে পুনর্গঠিত হতে না পারলে গণঅভ্যুত্থানের ফসল বেহাত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গত পাঁচ দশকে রাজনৈতিক দলগুলো গণমানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে ক্ষমতাসীন দলগুলো ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা চালিয়েছে, নির্বিচার মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে গত দেড় দশকে। ফ্যাসিবাদী সরকার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের ওপর নজরদারি চালিয়েছে। তারা মতপ্রকাশের মতো মৌলিক অধিকারও সংকুচিত করে আনে। গুম, হত্যা, দুর্নীতি, ত্রাস, আতঙ্ক ছড়িয়ে নাগরিকদের জিম্মি করে রাখে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এসব সহিংসতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নারীরা আন্দোলনে লড়াকু ভূমিকা পালন করেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েমের সম্ভাবনা জাগিয়ে দেয়।


























